শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

কত কথা কয় রে

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ:১৯:০৮,৪ অক্টোবর ২০২৬

কত কথা কয় রে

.

বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তার বক্তব্য নিয়ে মানুষ খুব ত্যক্ত বিরক্ত। মাইক হাতে নিয়ে উপস্থিত নেতাদের নাম বলতে বলতে অনেকটা সময় পার করে দেয়া, বিষয় ভিত্তিক কথা না বলে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা এবং দীর্ঘক্ষন ভাষণ দেয়া নিয়ে সচেতন সমাজও বিষ্মিত। তাদের মতে, নেতা হলেও সবাই সচেতন নন। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপ দরকার বলে মনে করেন তারা। তবে ইদানিং রাজনৈতিক সমাবেশ ছাড়াও অন্যান্য সভায়ও এমনটা দেখা যাচ্ছে। 


একাধিক প্রবীণ ব্যক্তি জানান, নারায়ণগঞ্জ রাজনৈতিক অঙ্গনে একসময়ে একাধিক তুখোড় বক্তা ছিলেন। তারা যখন বক্তব্য দিতো মানুষ তখন কান পেতে শুনতো। তাদের বলার ধরণ, তথ্য, যুক্তির কারনে মানুষ বিশ্বাসও করতো। ভালো বক্তা হিসেবে যার নাম সবাই সবার উপরে রাখেন তিনি হলেন, নাজিম উদ্দিন মাহমুদ। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার সাবেক এ চেয়ারম্যান এবং আওয়ামীলীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতার ভাষণ নিয়ে এখনও চর্চ্চা হয়। অবসরপ্রাপ্ত এক শিক্ষিকা জানান, তার বক্তব্য শুনলে শরীরের লোম শিউড়ে উঠতো। তিনি যখন ভাষন দিতেন তখন পিনপন নীরবতা থাকতো, দর্শকের মনযোগ থাকতো তার দিকে। তিনি ছাড়াও আরও কয়েকজন রাজনীতিক সুন্দর বক্তব্য দিতে পারতেন বলে জানা গেছে।


বক্তার বক্তব্যের মনযোগ নিয়ে কথা হয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ভবানী শংকর রায়ের সঙ্গে। অনুষ্ঠানে কারা অতিথি তা ব্যাণারে লেখা থাকা সত্বেও বক্তা যদি সব নাম বলেন তাহলে তা বিরক্তির কারণ হয়ে মনযোগের বিচ্যুতি ঘটায়। তার মতে, বক্তব্যে মূল কথা গুছিয়ে সংক্ষেপে বললে জনতার কাছে সঠিক বার্তা যায় এবং তাতে উপকৃত হয়। কথা বলা একটা শিল্প উল্লেখ করে কাউকে তোষামোদি না করে সহজ ভাষায় কথা বললে তা শ্রুতি মধুর হয় বলে মনে করেন এই আবৃত্তিকার ও অভিনেতা। ভবানী শংকর রায়ের মতে, এ নিয়ে বক্তাদেরই সচেতন হতে হবে।
রাজনীতি ও বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে জড়িত একাধিক ব্যক্তি জানান, অনেক অনুষ্ঠানে এমনও হয় যে সালাম দিতে দিতেই কয়েক মিনিট শেষ করে দিয়েছে বক্তা। এরপর বিষয়ের উপর না বলে নেতাকে তেল মর্দন করে কথা বলতেই থাকেন। তারপরেও যে আরও বক্তা আছে তাও ভুলে যান তিনি। এমন অবস্থায় দর্শক সারিতে অনেকেই বিরক্ত হলেও প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারেন না। তবে তারা একজন আরেকজনের সঙ্গে ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলাবলি করে ‘কত কথা বলে রে’।


বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার আমীর মাওলানা আব্দুল জাব্বার সময়ের গুরুত্বের উপর সবাইকে গুরুত্ব দিতে বললেন। তার মতে, বক্তাদের উচিত বিষয় ঠিক রাখা এবং কম সময়ে মূল কথা বলা। নাহলে অনুষ্ঠান হয়ে যায়, এতে করে অনেকে অনুষ্ঠানে থাকতে পারেন না। রাজনৈতিক সভা ছাড়াও ইদানিং প্রশাসনিক সভাগুলোতেও এ চর্চ্চা হচ্ছে বলে জানান এ রাজনীতিক।
নাগরিক সংগঠন আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’র সভাপতি নূর উদ্দিন আহমেদ জানালেন, মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে রাজনীতি করতো শিক্ষিত এবং যোগ্যতা সম্পন্ন সচেতন মানুষেরা। নিজের কারাবন্দি জীবনের কথা স্মরণ করে বললেন, তখন জেলে অনেক নেতাকে দেখেছি জ্ঞান চর্চ্চা করতে। এখন অনেকেই নেতা হয় তারা কতটুকু সচেতন সেই প্রশ্ন থেকে যায় তাদের কর্মকান্ডের জন্যই। তবে রাজনীতিতে একটা শ্রেনী এখনও ভালো আছে বলে মনে করেন এই প্রবীণ সমাজ সংগঠক।


জেলা বিএনপির এক পদধারী নেতা জানান, অনেক সময়ে সভা সংক্ষিপ্ত করতে কারও নাম বাদ পরলে সে রেগে যায়। মাইক না দেয়ায় মারামারির একাধিক ঘটনাও আছে। যা প্রকাশ্যেই ঘটেছে।
বক্তব্যে বক্তার বাড়াবাড়ি নিয়ে কথা হয় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে। বিষয়টি বিব্রতকর বলে তারা কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে কেউ কেউ এমন বক্তাদের মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে অভিহিত করেছেন।
কেন এমন পরিস্থিতি হয় এ প্রশ্নের জবাবে নারায়ণগঞ্জ জেলা মহিলা দলের সভাপতি রহিমা শরীফ মায়া বললেন, বড় দল সাথে অঙ্গ সংগঠন রয়েছে নেতা বেড়েছে তাই এমন হয়। তবে এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন এ নারী নেত্রি। তার মতে, সময়ের মূল্য দিতে হবে এবং সচেতন থাকতে হবে। তেলবাজি রাজনীতির কারনে দরকার না থাকলেও নেতার পদ পদবী উল্লেখ করে বক্তার বক্তব্য দেয়ার বিষয়টিও ঠিক নয় বলে মনে করেন রহিমা শরীফ মায়া।


পরিবর্তনের উপায় কী এমন প্রশ্নের জবাবে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি বলেন, এ দায়িত্ব সিনিয়রদের নিতে হবে। অনুষ্ঠানে যিনি সিনিয়র তাকেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তবেই পরিবর্তন সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৎপর পন্টির মতে, কোন বিষয়ের উপর জ্ঞান না থাকলে সে বিষয়ে বক্তব্য না রাখাই ভালো।
 

সম্পর্কিত বিষয়:

https://www.facebook.com/hellonarayanganjbd/

আরও পড়ুন