শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

কয়টা খুন করেছেন সেলিম ওসমান!

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ:২০:০৪,২৮ অক্টোবর ২০২৬

কয়টা খুন করেছেন সেলিম ওসমান!

.

‘৯৬’র আওয়ামীলীগ সরকারের আমলের মাঝামাঝি শহরের বোস কেবিনে শটগান হাতে নিয়ে ঢুকে দেওভোগের ইকবালকে হেনস্থা করেন সেলিম ওসমান। তখন তার সঙ্গে ছিলো খালেদ হায়দার খান কাজল সহ কয়েকজন। সে সময়ে তার ছোট ভাই শামীম ওসমান ছিলেন সরকার দলীয় এমপি। ছোট’র দাপটেই বড় মিয়া দাবড়ে বেড়াতেন সর্বত্র। তখন থেকেই এ জেলার চেম্বার্স অব কমার্স ইন্ড্রাষ্ট্রি সহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে মাতব্বরি শুরু তার।
তবে  পুরোদমে খবরদারি করেছেন ৯ম সংসদ থেকে আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত। এ সময়ে তিনি ছিলেন এ জেলার ‘বস’। সে সময়ে প্রথমে তার বড় ভাই নাসিম ওসমান জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য হন। এরপর দশম সংসদে নাসিম ওসমান ও শামীম ওসমান দুই ভাই এমপি ছিলেন তার। ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল নাসিম ওসমান মারা যাওয়ার পর ৩০ জুন উপ নির্বাচনে সেলিম ওসমান নিজেই জাতীয় পার্টির মনোনয়নে সংসদ সদস্য হন। একাদশে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন বাগাতে চেষ্টা করলেও শেষতক লাঙ্গলই জুটে তার কপালে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি জাতীয় পার্টির লাঙ্গল নিয়েই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এমপি হয়েছেন।


শেখ হাসিনা সরকারের এ পুরোটা সময়ে ভিন্ন দল করলেও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সংগঠনের দণ্ডমুন্ডের কর্তা ছিলেন সেলিম ওসমান। চেম্বার্স অব কমার্স ইন্ড্রাষ্টি, আইনজীবী সমিতি, রাইফেল ক্লাব, হোসিয়ারী এসোসিয়েশন, ইয়ার্ণ মার্চেন্ট সহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে তার নিয়মে চলতে হতো। নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের মতো এলিট শ্রেনীর সংগঠনেও তার কালো হাত পড়েছিলো। আর বিকেএমইএ এর মতো সনামধন্য ব্যবসায়ী সংগঠন ছিলো তার কব্জায়। তিনি নিজেই এ সংগঠনের শীর্ষ পদে একটানা ১৪ বছর ছিলেন। 


সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে বিকেএমইএর সভাপতির পদে ছিলেন সেলিম ওসমান। সর্বশেষ ২০১২ সালে ভোটের মাধ্যমে সভাপতি হন তিনি। এরপর আর ভোটের মুখ দেখেনি বিকেএমইএ। ২০১৪, ২০১৬, ২০১৯, ২০২১ ও ২০২৩ সালে সমঝোতার মাধ্যমে পর্ষদ করে সভাপতি হন সেলিম ওসমান। তিনি শীর্ষ পদে থাকার জন্য কিছু লোককে এ ব্যবসায়ী সংগঠনে ঢোকান। প্রতি নির্বাচনের আগে তার অনুগত এ ব্যবসায়ীরা ‘সেলিম ওসমানকে সভাপতি পদে চাই’ আওয়াজ তুলতো। প্রথমে সেলিম ওসমান কিছু বলতেন না। পরে তিনি বলতেন, আপনাদের কথায় আমি রাজি হলাম। একাধিক ব্যবসায়ী জানান, পুরো নাটকের স্ক্রিপ্ট রাইফেল ক্লাবে লেখা হতো। যারা এ নাটকে অংশ নিয়ে সেলিম ওসমানের জন্য জিকির তুলতেন তাদের দুই একজন এখনো বিকেএমইএতে আছেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা। ২০১৬ সালে কমিটির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়ে পদ আঁকড়ে ছিলেন তিনি।
এসব সংগঠন ছাড়াও সেলিম ওসমান তার নির্বাচনী এলাকা নারায়ণগঞ্জ সদরের দু’টি ইউনিয়ন ও বন্দরের ৫ টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তার মনোনীত কেউ হতো। এমনকি বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যানও তিনি ঠিক করে দিতেন। সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর পদেও তার আশীর্বাদ লাগতো।


দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে যখন বিএনপি-জামায়াত ইসলামী সহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশ নেননি। তারা সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলো। সে সময়ে সেলিম ওসমান বলেছিলেন, ভোট দিলে দেশদ্রোহীকে হত্যা করা হবে। 


২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর বন্দর সমরক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সেলিম ওসমান বলেন, ‘আপনারা আগামী ৭ জানুয়ারী ভোটকেন্দ্রে যাবেন। লাঙ্গল মার্কায় ভোট দিবেন। আর মনে করবেন একটা সিল দিলেন, একটা দেশদ্রোহীকে হত্যা করলেন।’ জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সানাউল্লাহ সানুর সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক এমপি হোসনে আরা বাবলি, শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী সহ অনেকে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ওই নির্বাচনে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে যায়নি। যারা সিল মেরেছে তারা সবাই সেলিম ওসমান কিংবা তখনকার সরকার দলীয় লোক। সেলিম ওসমানের কথায় সব সিলের বিপরীতে যদি দেশদ্রোহী (তার ভাষায়) হত্যা হয় তবে তখনকার গণতন্ত্রকামীদের হত্যার কথা বলা হয়েছে। সেই অপরাধে সেলিম ওসমানকে বিচারের মুখোমুখি কেন হতে হবে না এমন প্রশ্ন তাদের।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের অনেকের বিচার দাবি করলেও তাদের সহযোগী জাতীয় পার্টির সেলিম ওসমানের বিচার দাবি জোরালোভাবে তেমন উঠে না। তার বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও এখনও দেশেই বাস করছেন তিনি। বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মী গ্রেপ্তার হলেও সেলিম ওসমান কেন গ্রেপ্তার হবে না এমন প্রশ্ন উঠেছে অনেকের মাঝে। স্থানীয় বিএনপি নেতারাইবা কেন তার ব্যাপারে চুপ। তিনি কী তবে বিশেষ কেউ, যে সব সময়ে সব মহল ম্যানেজ করতে পারে।
 

সম্পর্কিত বিষয়:

https://www.facebook.com/hellonarayanganjbd/

আরও পড়ুন