শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

গোপন করলেই কি গোপন থাকে

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ:২০:২৩,৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গোপন করলেই কি গোপন থাকে

সেলিনা হায়াৎ আইভী, ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ লাভলু, সেলিনা সুলতানা

নারায়ণগঞ্জের গন্ডি ছাড়িয়ে দেশ জুড়ে পরিচিত সেলিনা হায়াৎ আইভী। অপরদিকে ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ লাভলু এ শহরে বেশ পরিচিত। সেই তুলনায় সেলিনা সুলতানার পরিচয় তার প্রয়াত স্বামীকে ঘিরেই। তিনি ফতুল্লা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার লুৎফর রহমান স্বপনের স্ত্রী।

২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর খন্দকার লুৎফর রহমান স্বপন মারা গেছেন। ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ফতুল্লা ইউনিয়ন নির্বাচনে তিনি আওয়ামীলীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনয়নে চেয়ারম্যান হন। এর আগে তিনি এ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ছিলেন এবং ২০১১ সালে ফতুল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূর হোসেন মারা গেলে স্বপন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। সে সময়ে এ এলাকার অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামীলীগের সারাহ বেগম কবরী।

ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ লাভলু শহরে পরিচিত ছিলেন তার পরিবারের জন্যই। তার বাবা মহিউদ্দিন আহমেদ ওরফে খোকা মহিউদ্দিন রাজনীতিক ছিলেন সেই সঙ্গে চলচ্চিত্র প্রযোজক। তার বাবা শহরের গুলশান সিনেমা হলের মালিক ছিলেন। তবে ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালিন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে লাভলু নতুনভাবে পরিচিতি পান। বাবার নাম ভুলে গিয়ে শামীম ওসমানের বেয়াই কিংবা অয়ন ওসমানের শ্বশুর পরিচয়ে তিনি পরিচিতি পান।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০৪ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে তার বাবা আলী আহাম্মদ চুনকার পরিচয়ে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেন। তবে ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে তার ব্যক্তি ইমেজ কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। একইভাবে পরবর্তী দু’টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও তার ব্যক্তি পরিচয়ই প্রাধন্য পায়।

ফয়েজ উদ্দিন লাভলু তার বাবার ও সেলিনা সুলতানা  তার স্বামীর পরিচয়ের ব্যাপারে কিছুটা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন বলে মনে করেন সচেতন মহল। ফয়েজ উদ্দিন লাভলু বিগত সময়ে তার বাবা মহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকীতে গণমাধ্যমে সংবাদ পাঠালে সেখানে তার বাবাকে আওয়ামীলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। বিষয়টি সত্যি বলে দাবি করেছেন অনেকে। লাভলুর বাবা পাকিস্তান আমলে নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তবে এরশাদের ক্ষমতাকালে মহিউদ্দিন আহমেদ  (খোকা মহিউদ্দিন) জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এ কথা বেমালুম চেপে যেতেন লাভলু। অনেকে বিষয়টিকে ‘চালাকি’ বলে মনে করেন।

একইভাবে খন্দকার লুৎফর রহমান স্বপন চেয়ারম্যানের স্ত্রীও কিঞ্চিত চালাকি করছেন। তিনি তার স্¦ামীর মৃত্যু বার্ষিকীতে নানা পরিচয় উত্থাপন করলেও আওয়ামীলীগের বিষয়টি বেমালুম চেপে যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তা স্বীকার করলেও এখন আর তা মুখে নেন না। সম্প্রতি স্বপন চেয়ারম্যানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে সাবেক চেয়ারম্যান, সমাজকর্মী বললেও তিনি যে আওয়ামীলীগ নেতা ছিলেন তা বলেননি। প্রসঙ্গত, খন্দকার লুৎফর রহমান স্বপন ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি ছিলেন এবং দলের মনোনয়নেই তিনি চেয়ারম্যান হন।

এ নিয়ে জানতে চাইলে ফতুল্লা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার লুৎফর রহমান স্বপনের স্ত্রী সেলিনা সুলতানা বলেন, এটা খুব সহজ প্রশ্ন। আমি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নই। আমার স্বামী আওয়ামীলীগের নেতা ছিলেন। আমি কোন দলের রাজনীতিতে নেই। যে ভালো তাকে পছন্দ করি। এখন যদি প্রোগ্রাম করি আওয়ামীলীগ শুনলে মানুষ আসবে না, ভয় পাবে। তিনি (স্বপন চেয়ারম্যান) জনপ্রতিনিধি ছিলেন মানুষের জন্য কাজ করেছেন এ পরিচয়ই বড়।

 

রাজনীতিতে এমন চালাকি প্রসঙ্গে কথা হয় কথা হয় রাজনীতিক ও আইনজীবী আওলাদ হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, রাজনীতি হলো তাদের জন্য যারা নীতি আদর্শ বজায় রেখেছেন। একশ্রেনীর মানুষ আছে যারা সব সময়ে সুযোগ সুবিধা, প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতাবান হওয়ার জন্য রাজনীতিতে আসেন। তাদের মধ্যে কোন নীতি আদর্শ নাই। তারা সুযোগ বুঝে রূপ পাল্টান বলে মন্তব্য গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন।

তবে ব্যতিক্রম ঘটনারও উদাহরণ রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তারের সময়ে তিনি জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছিলেন। যা আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো। কারও মতে, এ সময়ে তিনি স্লোগান না দিলেও পারতেন। আবার কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, তিনি যা বিশ্বাস করেন কিংবা যে আদর্শ লালন করেন তাই মুখে উচ্চারণ করেছেন। তার এ বলার মধ্যে কোন রকম ভন্ডামি ছিলো না বলেও মনে করেন অনেকে।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সুবিধার জন্য কেউ কেউ স্বজনের নাম ভুলে যান। তারা রাজনীতি করে নিজের আখের গুছাতে। যখন দলের সু সময় থাকে তখন তারা সুবিধা নেয়। ঠিক তেমনিভাবে তাদের স্বজনরাও সু সময়ে সুযোগ নেয় আবার দুঃসময়ে তা ভুলে যায়।

https://www.facebook.com/hellonarayanganjbd/

আরও পড়ুন