শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ:২১:৪৫,১৫ অক্টোবর ২০২৬
.
রাজনৈতিক সমাবেশ-মিছিলে বেয়াদবি যেন দিন দিন স্থায়ী রূপ পাচ্ছে। বাদ নেই পরিবার এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। কাউকে সমীহ করাকে ‘ছোট হওয়া’ মনে করে এক শ্রেনীর মানুষ। তাই নিজেকে বড় সাজাতে বেয়াদবির মতো সামাজিক রোগকে বেছে নিয়েছে তারা। সচেতন মহল বলছেন, প্রযুক্তির প্রভাবে কারো কারো আচরণগত পরিবর্তন হয়েছে। এ থেকে বের হতে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সুস্থ রাজনীতি ভূমিকা রাখতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক বড় রাজনীতিকও বেয়াদবির ঘটনা ঘটিয়েছে। অতীতে দুই রাজনীতিকের ঝগড়ায় পাঞ্জাবী ছেড়ার গল্প এখনো মুখে মুখে। বাস ভাড়া নিয়ে জেলা প্রশাসনে তখনকার সংসদ সদস্য, সম্পর্কে চাচীকে হেনস্থা করার ভিডিও সারাদেশবাসী দেখেছে। মতের অমিল হওয়ায় সিনিয়র রাজনীতিককে জুনিয়র দিয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও আছে। ৫ আগস্টের পরেও এমন ঘটনা ঘটেছে কয়েকটি। সম্প্রতি একটি পেশাজীবি সংগঠনের এমন ঘটনা নিয়েও সমালোচনা এখনো মুখে মুখে। এর আগে একাধিক নেতাকে লাঞ্ছিত, প্রায়ই দিগম্বর করার চিত্রও দেখেছে মানুষ। এসব ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস প্রাঙ্গন সহ নানা জায়গায় একে অপরকে হেয় করার ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন এত বেয়াদব তৈরী হচ্ছে, এর পেছনের কারিগর কারা। কেউ বলছেন, রাজনীতির অপ ব্যবহার, কারো মতে, পারিবারিক শিক্ষার অভাব এ জন্য দায়ী। অনেকে আবার সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনকেও দায়ী করছেন।
নাগরিক সংগঠন আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’র সভাপতি নূর উদ্দিন আহমদে বলেন, এরকম আগেও ছিলো তবে ইদানিং বাড়তির দিকে। তার মতে, রাজনীতির এক শ্রেণীর সুশীল রাজনীতি করে আবার একটা অংশ মন্দ কাজে জড়িত থাকে। ওই অংশের প্রশ্রয়েই বেয়াদব তৈরী হয়। তবে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে আশাবাদি এ সমাজ নেতার।
অনেকে মনে করেন, একদিনে এমন হয়নি। দীর্ঘ দিন ধরে রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থার অপচর্চ্চা এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। তাদের মতে, দেশে সু শাসনের ধারাবাহিকতা থাকলে সব মন্দ কাজ কমে যাবে।
সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক এর নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল এর মতে, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। পারিবারিক শিক্ষা একটা ব্যাপার পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বেও সমস্যা আছে। সামাজিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং সামাজিক অবক্ষয়ের জোর দিয়ে জুয়েল জানান, একান্নবর্তী পরিবার একজন শিশুকে মানুষ গড়তে বড় ভূমিকা রাখে। তবে এখন তা আর নেই। আগে গ্রামের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা শক্তিশালী ছিলো এখন তাও নেই। সুজন সভাপতি মনে করেন, একদিনে যেমন সমস্যা তৈরী হয়নি তেমনি সমাধান হতেও সময় লাগবে।
সামাজিক অবক্ষয়ের এমন অবস্থার পেছনে মানুষজন অপসংস্কৃতিকেও দোষ দেয়। বিদেশী অপসংস্কৃতির প্রভাবে অবক্ষয় বেড়েছে। পাশাপাশি কোথাও কোথাও অযোগ্যরা সংস্কৃতির ধারক বাহক হওয়ায় রুচির দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। এতে কোনটা গ্রহণ করা জরুরী আর কোনটা ত্যাগ করা উচিত তা বুঝতে পারে না সবাই।
জীবন যাবন সব কিছু সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থ। তার মতে, পরিবারে বড়রা যদি ঠিক থাকে তবে ছোটরা ভালো হবে। সাংস্কৃতিক জগতের সাথে জড়িত থাকলে অন্যায় কাজ কম করে মতামত ব্যক্ত করে তিনি বলেন, অপসংস্কৃতির প্রভাব পড়বে না যদি পরিবার ঠিক থাকে। তিনিও এ ক্ষেত্রে যৌথ পরিবারের বড় ভূমিকার কথা বলেন।
পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি কেউ কেউ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কথা বলেছেন। তাদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীকে সত্যিকার মানুষ গড়তে বড় ভূমিকার রাখতে পারে। শিক্ষকদের সু আচরণ দেখেও তারা শিখতে পারে।
এ বিষয়ে কথা হয় নারায়ণগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ ড. ফজলুল হক রুমন রেজার সঙ্গে। তার মতে, করোনার সময়ে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। প্রযুক্তির প্রভাবে কারো কারো মাঝে আচরণগত পরিবর্তন আসতে পারে। তবে তা সামগ্রিক চিত্র নয়। পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনও সুদৃঢ় করা উচিত। কারণ ঘরে ঘরে মোবাইল আসক্তি ছড়িয়ে পড়ায় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনেও কিছুটা শৈথিল্য এসেছে।